বিতর্কিত ইবাদত শবে বরাত

মহিমান্বিত তিনটি রাত বইয়ের একাংশ:-
 শবে বরাত বা লায়লাতুল বরাত সত্যি একটি বিতর্কিত ইবাদতের রাত। এই রাত ইবাদতের কোন রাত কিনা তা নিয়ে বিস্তর মতপার্থক্য রয়েছে। কুরআনে এই রাত সম্পর্কে কোন কথাই নেই। অনেকে সূরা আদ দুখানের নিম্নোক্ত আয়াতটিকে লায়লাতুল বারাত সম্পর্কিত বলে দাবি করেন। 'হা-মিম! স্পষ্ট কিতাবের শপথ নিশ্চয়ই আমি তা বরকতময় রাতে নাযিল করেছি। নিশ্চয়ই আমি মানুষদের সতর্ককারী। ঐ রাতে প্রতিটি হেকমত পূর্ণ বিষয় আমার তরফ থেকে জারী করা হয়।' যদি উল্লেখিত আয়াতের লায়লাতুল মুবারাকাহ শব্দ দুটিকে বরাতের রাত ধরা হয় তবে আয়াতের অর্থ দাঁড়ায় এই যে, আল্লাহ তায়ালা কুরআন শরীফ শাবান মাসের ১৫ তারিখ নাযিল করেছেন। অথচ কুরআনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, ১. 'আমি কুরআনকে কদরের রাতে নাযিল করেছি।' (সূরা কদর) ২. 'রমজান মাসে কুরআন নাযিল হয়েছে' (সূরা বাকারা)। অতএব উপরোক্ত ধারণা একেবারেই ভুল। এবার হাদীস দিয়ে একটু যাচাই করে দেখা দরকার এই রাতের ইবাদতের জরুরত কতখানি? হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক রাতে আমি নবী করীম (সা.)-কে বিছানায় পেলাম না, তাই আমি তার তালাশে বের হলাম। অতঃপর আমি বাকী নামক কবরস্থানে তাঁকে আকাশের দিকে মাথা উঠানো অবস্থায় দেখতে পেলাম। তখন তিনি বললেন, হে আয়েশা! তুমি কি এ ধারণা করছো যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তোমার ওপর যুলুম করছেন? আয়েশা (রা.) বলেন, আমি তদ্রুপ ধারণা করিনি। তবে আমি ভেবেছিলাম আপনি আপনার অপর কোন স্ত্রীর কাছে গেছেন। তখন নবী (সা.) বলেন, 'নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা শাবান মাসের ১৫ তারিখের রাতে প্রথম আকাশে অবতীর্ণ হন। অতঃপর তিনি কালব গোত্রের বকরীগুলোর পশমসমূহের চেয়েও বেশি লোকের পাপ ক্ষমা করেন। (ইবনে মাজা, তিরমিযি, মিশকাত) ২. হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, নবী (সা.) বাকী নামক কবরস্থানে সিজদারত ছিলেন এবং দীর্ঘক্ষণ সিজদায় কাটান। আমি ধারণা করলাম হয়ত তাঁর জীবন চলে গেছে। এরপর তিনি সালাম ফিরিয়ে আমার দিকে দৃষ্টিপাত করলেন। (মিশকাত তৃতীয় খণ্ড) ৩. হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) আমার কাছে এসে তাঁর গায়ের কাপড় খুলে ফেললেন। এরপর তিনি না ঘুমিয়ে দন্ডায়মান রইলেন। অতঃপর কাপড় আবার পরিধান করলেন। আমি ধারণা করলাম যে তিনি আমার কোন সতীনের কাছে যাবেন। এতে আমার খুব হিংসা হলো। তাই আমি তাঁকে অনুসরণ করলাম। অতঃপর আমি তাঁকে বাকিওল গারকাদ নামক কবরস্থানে পেলাম। তিনি মুমিন নারী পুরুষ ও শহীদগণের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করছেন। (মাছাবাতা বিসুন্নাহ) ৪. হযরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন, যখন শাবান মাসের মধ্যবর্তী ১৫ তারিখের রাত উপস্থিত হয় তখন তোমরা সে রাতে ইবাদতে দন্ডায়মান হও এবং দিনে রোজা রাখ। কারণ সে রাতে আল্লাহ তায়ালা সূর্যাস্তের সাথে সাথে প্রথম আকাশে অবতরণ করেন। অতঃপর বলতে থাকেন কে আছ ক্ষমাপ্রার্থী আমি তাকে ক্ষমা করব। কে আছ রিযিকপ্রার্থী আমি তাকে রিযিক দেব, কে আছ বিপদগ্রস্ত আমি তাতে বিপদমুক্ত করব। প্রভাত হওয়া পর্যন্ত আল্লাহ তায়ালা এরূপ বলতে থাকেন। (ইবনে মাজা, পৃষ্ঠা ৯৯, মিশকাত) হযরত আয়েশা (রা.)-এর প্রথম তিনটি হাদীস একই বছরের বর্ণনা হতে পারে আবার ভিন্ন ভিন্ন বছরের ঘটনাও হতে পারে। সে যাই হোক উপরোক্ত হাদীস তিনটি পড়ে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে এই রাতের ফজিলত সম্পর্কে হযরত আয়েশা (রা.) কিছুই জানতেন না। এই রাতটি যদি ইবাদতের জন্য কোন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ রাতই হতো তাহলে হযরত আয়েশা (রা.)-এর তা অজানা থাকবে কেন? তিনি খুঁজে খুঁজে রাসূল (সা.)-কে গোরস্থানে আবিষ্কার করলেন। তিনটি হাদীস থেকেই জানা যায় রাসূল (সা.) সে রাতে কবরস্থানে ছিলেন। নিশ্চয়ই কবরস্থান কোন ইবাদতের জায়গা নয়। অতএব তিনি কবরস্থানে গিয়েছিলেন কবর জিয়ারত এবং মৃত ব্যক্তিদের জন্য দোয়া করতে। ৪ ও ৫ নং হাদীস অনুযায়ী প্রমাণিত হচ্ছে যে, এটি একটি নফল ইবাদতের রাত। যদিও হাদীস দুটি সহীহ নয়, মুরসাল। তারপর মহান আল্লাহ রাতের শেষ প্রহরে অর্থাৎ তাহাজ্জুদের সময় তো প্রতিদিনেই ঘোষণা দেন, কে আছ ক্ষমাপ্রার্থী আমি তাকে ক্ষমা করে দেব, কে আছ রিযিপ্রার্থী আমি তাকে রিযিক দান করব, কে আছ বিপদগ্রস্ত আমি তাকে বিপদ মুক্ত করব... প্রভাত হওয়া পর্যন্ত মহান আল্লাহ এরূপ ঘোষণা দিতে থাকেন। উপরোক্ত হাদীস অনুযায়ী এই রাতে সেই ঘোষণা শুরু হয় সূর্যাস্তের পর থেকে। হতে পারে। উপরোক্ত হাদীস দুটিতে প্রমাণিত হয় যে, রাতটি নফল ইবাদতের রাত। দোয়া কবুলের রাত। এই রাত সম্পর্কে এবং এই মাস সম্পর্কে আরও কয়েকটি হাদীস আছে। যেমন- ক. রজব মাস শুরু হলে রসূল (সা.) এই দোয়াটি পড়তেন। 'হে আল্লাহ আমাদের জন্য রজব ও শাবান মাসের বরকত দান করুন এবং আমাদের রমজান মাস পর্যন্ত পৌঁছে দিন।' খ. রাসূল (সা.)-কে শাবান মাস ছাড়া অধিক রোজা অন্য কোন মাসে রাখতে দেখিনি। (বুখারী) গ. অন্যান্য মাসের তুলনায় (রমজান ছাড়া) শাবান মাসের রোজা রসূলুল্লাহর (সা.) এর নিকট অধিক প্রিয় ছিল। (আবু দাউদ) ঘ. রাসূল (সা.) বলেন, শাবানের ১৫ তারিখের পরে আর রোজা রেখো না। উল্লেখ আছে, সর্বপ্রথম ভারতের বিহার অঞ্চলে এই ১৫ই শাবান রাতকে শবে বরাত নামকরণ করে খুব জাঁকজমকের সাথে হিন্দুদের দেয়ালী পূজার অনুকরণে এই রাতটি উদযাপন করে। সে দেশে এই নতুন প্রথাটি খুব খ্যাতিলাভ করে তখন আনাড়ি লোকেরা তা পুথি-পুস্তকে লিপিবন্ধ করে এর প্রশংসায় আজগুবী ফজিলত ও কিচ্ছা কাহিনী দ্বারা ভরপুর করে দেয়। ভারতের অন্য এলাকায়ও এই প্রথাটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এরপর 'মুকসুদুল মুমেনীন' নামক বাংলা কিতাবটি পূর্ব রঙের ওপর আরও রঙ ছড়িয়ে অতিরঞ্জিত ব্যাখ্যা ও কিচ্ছা কাহিনীতে পূর্ণ করে বাংলাদেশের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়। এই কাজের সবচেয়ে বড় পৃষ্ঠপোষক যে ইবলিশ, তাতে কোন প্রকার সন্দেহ থাকতে পারে না। কারণ ইবলিস জানে শরীয়তের মধ্যে, ইবাদতের মধ্যে নতুন কিছু সংযোজন করা নামই বিদআত। আর বিদআতকারীর পরিণাম জাহান্নাম। প্রচলিত শবে বরাতে করণীয় প্রতিটি কাজই বিদআত এবং শিরকে পূর্ণ। যেমন- ক. ইবাদতের অংশ হিসেবে হালুয়া রুটি তৈরি করা। কোন কোন এলাকায় এ রোজার নামই রুটির রোজা। রমজানের রোজার নাম আল্লাহর রোজা। আর এই শাবান মাসের রোজার নাম রুটির রোজা। কারো কারো মতে হালুয়া রুটি না হলে শবে বরাতই হয় না। তারা খুব জোর দিয়েই বলেন, এই তারিখে রাসূল (সা.)-এর দান্দান মোবারক শহীদ হয়েছিল। আর ফাতেমা (রা.) তখন পিতার জন্য নরম রুটি ও হালুয়া বানিয়ে নিয়ে এসেছিলেন। অতএব, এই দিনে হালুয়া রুটি বানানো এবং খাওয়া সুন্নাত। তামাশা আর কাকে বলে? রাসূল (সা.)-এর দাঁত শহীদ হয়েছিল ওহুদের যুদ্ধে যা সংঘটিত হয়েছিল শাওয়াল মাসে। তারপর যদি ধরেও নেয়া হয় যে, এই মাসেই তাঁর দাঁত শহীদ হয়েছিল আর তিনি হালুয়া রুটি খেয়েছিলেন। দাঁত ভেঙে অসুস্থ হয়ে তিনি নরম হালুয়া রুটি খেলেন। এই হালুয়া রুটি খাওয়া হলো সুন্নাত, আর ইসলামকে বিজয়ী করার জন্য দাঁত ভাঙলেন, রক্ত ঝরালেন তা সুন্নাত হলো না? খ. অনেক এলাকায় হিন্দুদের দেওয়ালী পূজার অনুকরণে আলোকসজ্জা করা হয়। কল্পনা করা যায় কত বড় মুর্খতা? গ. ভিক্ষা করা ইসলামে হারাম। হাদীসে রাসূল (সা.) বলেছেন, 'যার এক বেলার খাদ্য আছে সে যেন অপরের কাছে হাত না পাতে।' অথচ এই দিনে ভিক্ষাবৃত্তিকে যেন উৎসাহ দেয়া হয়। আর ঢাকাসহ বড় বড় শহরের মসজিদ ও মাজারগুলোর সামনের রাস্তায় হাজার হাজার ভিক্ষুকের সমাগম হয়। শুনেছি অনেক ধনী ভিক্ষুকও এদিন ভিক্ষাবৃত্তিতে নেমে পড়ে। অনেকে অধিক সওয়াবের আশায় এ রাতে দুহাতে দান করেন। এমন লোকও আছে যারা প্রকৃত ভিক্ষক নয় কিন্তু এই দিনে সখ করে ভিক্ষা করতে আসে। এতো গেল রুটি হালুয়ার কথা! এ রাতের ইবাদতের মধ্যে ঢুকে গেছে পরিপূর্ণভাবে আরও অনেক বিদআত। আমি নমুনা স্বরূপ কয়েকটি উদাহরণ পেশ করছি : এটি হাদীস হিসাবে 'বার চাঁদের ফজিলত ও মুকসুদুল মুমীনুন' বইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, '১৫ই শাবান সন্ধ্যার পর গোসল করা উচিত। হযরত রাসূল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি ১৫ই শাবান রাত্রিতে ইবাদতের নিয়তে গোসল করে তার জন্য প্রতি ফোঁটা পানিতে সাতশ' রাকাত নফল নামাযের সওয়াব লেখা হবে। গোসলের পর দু'রাকাত তাহিয়াতুল অজু' নামাযের প্রত্যেক রাকাতে সূরা ফাতিহার পর সূরা 'ইন্না আনযালনা হু' একবার ও সূরা ইখলাস ২৫ বার পড়তে। রাসূল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি এই নামায এভাবে আদায় করবে তার সকল গুনাই মাফ হয়ে যাবে। সে সদ্যপ্রসূত শিশুর ন্যায় নিষ্পাপ হবে।' আরেকটি বর্ণনা এভাবে আছে, শবে বরাতে যে ব্যক্তি একশ' রাকাত নামায পড়বে, প্রতি রাকাতে সূরা ফাতিহার পর সূরা ইখলাস ১১ বার পড়বে তার জন্য কিরামান কাতিবিনকে আল্লাহ এরূপ হুকুম দেবেন যে, আমার এই বান্দার কোন গুনাহ আমল নামায় লিখ না এবং এক বছর পর্যন্ত শুধু তার নেকিগুলোই লেখা হবে। আরো বহু ভিত্তিহীন মনগড়া হাদীস এই শবে বরাতকে উদ্দেশ্য করে তৈরি করা হয়েছে। আসলে এগুলো একটাও হাদীস নয়। অথচ রাসূল (সা.) বলেছেন, 'আমি যা বলিনি (অর্থাৎ যা হাদীস নয়) তা যদি কেউ আমার নামে প্রচার করে তাহলে সে যেন জাহান্নামে তার ঘর তৈরি করে নিল।' (সহীহ বুখারী ও মুসলিম) যারা শবে বরাত উপলক্ষে উপরোক্ত পদ্ধতিতে নামায পড়ে, তারা সম্পূর্ণরূপে বিদআতকারী। আর যারা বই-কিতাব ও ওয়াজ নসিহতের মাধ্যমে ঐ সব জাল হাদীস প্রচার করে- রাসূল (সা.)-এর হাদীস অনুযায়ী তারা তাদের ঘর জাহান্নামে তৈরি করে নিয়েছে। (অস্তাগফিরুল্লাহ!) ইবাদতের নামে সওয়াবের আশায় আর একটি বিদআত আমাদের সমাজে খুব জরুরী মনে করে পালন করা হয়। তাহলো সবিনা খতম। মাইক দিয়ে সবিনা খতম পড়া শরীয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ নাজায়েয। যারা খতম পড়েন এবং যারা আয়োজন করেন তারা কেউই এই আমলের দ্বারা লাভবান হতে পারেন না। মাইক দ্বারা কুরআন পড়লে বাধ্যতামূলকভাবে কুরআনের আওয়াজ সকলের কানে পৌঁছানো হয়। এতে কোন রোগীর ক্ষতি হতে পারে, কোন ঘুমন্ত ব্যক্তির ঘুম ভেঙে যেতে পারে। বিভিন্ন মানুষ বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকে, কুরআনের আওয়াজ কানে যাওয়া সত্ত্বেও অনেকেই আদবের সাথে কুরআন শোনার সুযোগ পায় না। তাই এই কাজ মোটেই জায়েজ নয়। এতে বরঞ্চ মানুষকে কষ্ট দেয়া এবং কুরআনকে অপমাণ করার পাপে পাপী হতে পারে। অথচ কুরআন পাঠের সময় তা মনোযোগ দিয়ে শুনার জন্য তাকিদ দেয়া হয়েছে। শবে বরাত উপলক্ষে বিশেষ নিয়মের কোন নফল নামাযের কথা সহীহ হাদীস অথবা ফিকহের কিতাবেও উল্লেখ নেই। অথএব ভিত্তিহীন মনগড়া ইবাদত আমরা কেন করব? আমাদের জানতে হবে ইবাদত কাকে বলে? রাসূল (সা.) যে কথা যে কাজ যেভাবে করতে বলেছেন সেই কথা, সেই কাজ, সেভাবে বেশি বেশি করে কুরআন ও হাদীস পড়তে হবে। এই পড়া থেকে দূরে সরে যাওয়ার কারণেই ইবলিস ও তার দোসররা খুব সহজেই আমাদের দ্বারা বিদআতী, ফাসেকী কাজ করাতে পারে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন রাসূল (সা.)-এর কাছে জিবরাইল (আ.)-এর মাধ্যমে প্রথম যে বাণী পাঠিয়েছিলেন মানুষের জন্য, মানব জাতির জন্য, সেই প্রথম কথা, প্রথম অহী, প্রথম দিক নির্দেশনা হলো; 'ইক্বর' বিসমি রাব্বীকাল লাজী খলাক্ব। খালক্বাল ইনসা-না মিন আ'লাক। ইক্বর' ওয়া রাব্বুকাল আকরাম। আল্লাজী আ'ল্লামা বিল ক্বালাম। আ'ল্লামাল ইনসা-না মা-লাম ইয়া'লাম।' (সূরা আলাকের প্রথম পাঁচটি আয়াত)। এর সরল অর্থ, 'পড়! তোমার প্রভুর নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন জমটা বাঁধা রক্তপি- থেকে মানুষকে। পড়, তোমার রব বড়ই অনুগ্রহশীল। যিনি কলমের সাহায্যে জ্ঞান শিক্ষা দিয়েছেন। মানুষকে এমন জ্ঞান দিয়েছেন যা সে জানতো না।' আল্লাহর তরফ থেকে উম্মতে মুহাম্মদীর ওপর প্রথম নির্দেশ। প্রথম ফরজই হলো 'পড়' অত্যন্ত বেদনার সাথে বলতে হয় আমরা পড়াই ছেড়ে দিয়েছি। রাসূল (সা.) বিদায় হজ্জের ভাষণে বলেছেন, 'তোমাদের কাছে দু'টি জিনিস রেখে যাচ্ছি, তা যদি তোমরা আঁকড়ে ধরে রাখ, তাহলে তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না। তা হলো কুরআন ও আমার সুন্নাহ। তারপরও আমরা কুরআন-হাদীস পড়ি না, অধ্যয়ন করি না, বুঝি না। আর এই সুযোগেই ইবলিশ আমাদের দিয়ে ইবাদতের নামে বিদআত করাচ্ছে, দ্বীনদারির নামে করাচ্ছে ফাসেকি কাজ। শাবান মাস যে বরকতময় মাস, এ মাসে রাসূল (সা.) বেশি করে সিয়াম পালন করতেন। এতে তো কোন সন্দেহ নেই। আমরাও এ মাসে বেশি করে নফল সিয়াম পালন করতে পারি। এই বছরের জন্য এই মাসের ১৫ তারিখ শেষ নফল সিয়াম। কারণ রাসূল (সা.) বলেছেন, 'তোমরা শাবানের ১৫ তারিখের পরে আর নফল সিয়াম করো না।' এই রাতে নফল সালাত আদায়ও নিঃসন্দেহে সওয়াবের কাজ। আর নফল সালাত তো প্রতি রাতের জন্যই সওয়াবে আমল। কিন্তু তাই বলে মনগড়া নিয়ম পদ্ধতিতে নফল পালন করার নাম সওয়াব নয়। ফরজের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে নফল নামায পড়ার মধ্যে সাওয়াব নেই। সকল মুসলিম উম্মাহর প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, আসুন আমরা কুরআন ও সুন্নাহ অধ্যয়ন করি, তাহলে ইবাদত ও বিদআতের পার্থক্য বুঝতে পারব। নিজেকে সত্যিকার অর্থে মুমিনরূপে গড়ে তুলতে হলে, সর্বপ্রকার বিদআতী-ফাসেকি থেকে রক্ষা পেতে হলে ইবলিশের ধোঁকা থেকে বাঁচতে হলে, পড়ার কোন বিকল্প নেই। তাই আসুন আমরা বুঝে, উপলব্ধি করে কুরআন পড়ি, হাদীস পড়ি এবং সমাজের প্রত্যেক মুসলিমের কাছে পৌঁছে দেই তার দাওয়াত। আমাদের সমাজটা সত্যি সর্বপ্রকার গুনাহ ও কুসংস্কারে জর্জরিত হয়ে আছে। সমাজকে র্শিক, বিদআত, ফাসেকী থেকে উদ্ধার করার চেষ্টা করা আমাদের ঈমানী দায়িত্ব। মহান আল্লাহ যেন আমাদের ইবাদত ও বিদআতের পার্থক্য বোঝার তৌফিক দান করেন। আমীন।