লেখক: মনসুর আহমদ।
মাসুদা সুলতানা রুমী
ইসলামী সাহিত্য জগতের এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক। মাসুদা সুলতানা জাতীয় আদর্শ এবং ঐতিহ্য সচেতন এক নির্ভীক কলম সৈনিক। ইসলামী সাহিত্য রচনার জগতে তিনিই একমাত্র নারী যার গল্প, কবিতা শিশু সাহিত্য ও প্রবন্ধের সব ক্ষেত্রে রয়েছে সাহসী বিচরণ। তাঁর কবিতা জীবনের এক নতুন ইঙ্গিত নিয়ে এসেছে। কবিা মাসুদা সুলতানা রুমী ১৯৬০ সালের ৮ এপ্রিল গোপালগঞ্জ জেলার নওহাটা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মো. ফখরুল ইসলাম মোল্লা এবং মাতার নাম বেগম মমতাজ ইসলাম। তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা বিএ। তাঁর স্বামী প্রকৌশলী নূর মোহাম্মদ।
রুমী স্কুল জীবন থেকেই কবিতা লেখা শুরু করেন। মাসিক সংস্কার পত্রিকায় প্রথম তাঁর ‘উম্মে আয়মান’ নামে প্রকাশিত হয়। তখন থেকেই তার কাব্য জগতে প্রবেশ। রুমীর কবিতায় গোটা বিশ্বের মুসলমানদের কথা এসেছে। মুসলিম ইতিহাস ও ঐতিহ্য সচেতন কবি রুমী উচ্চারণ করেছেন-
স্পেনকে মুসলিম শূন্য করার নীল নকশা
বাস্তবায়িত করল ফার্ডিন্যান্ড আর ইসাবেলা
আশ্রয়ের নামে মসজিদে ঢুকিয়ে আগুনে পুড়িয়ে
জাহাজে চড়িয়ে সমুদ্রে ডুবিয়ে...
কবি মুসলমানদের আহ্বান জানিয়েছেন। জেগে ওঠার জন্য ঐক্যবদ্ধ হওয়ার জন্য :
এসো জ্বলে উঠি আরেকবার
স্পেন বিজয়ী তারেক মুসার মত
জেরুসালেম বিজয়ী সালাউদ্দীনের মত
ছিনিয়ে নিতে পুনঃ স্পেন জেরুসালেম
আফগানিস্তান, ইরাক, কাশ্মীর চেচনিয়া,
কবি মাসুদা সুলতানা কবিতার পাশাপাশি শিশুদের জন্য গল্প লিখে চলেছেন বিভিন্ন পত্রিকার সাহিত্য পাতায়। তবে তাঁর সবচাইতে বড় অবদান ইসলামের বিভিন্ন দিক নিয়ে পুস্তক রচনার ক্ষেত্রে তাঁর লিখিত এসব ইসলামী সাহিত্য পাঠকদের মধ্যে বেশ সাড়া জাগিয়েছে। মাসুদা সুরতানা রুমী প্রকাশিত কয়েকখানা বই : ‘যুগে যুগে দাওয়াতী দ্বীনের কাজে মহিলাদের অবদান’, ‘মহিমান্বিত তিনটি রাত’, ‘কুসংস্কারাচ্ছন্ন ঈমান’, ‘স্মৃতির অ্যালবামে তুলে রাখা দিন’, ‘নামাজ বেহেশতের চাবি’, ‘ভালোবাসা পেতে হলে’, ‘তাকওয়াই হোক মো’মিন জীবনের লক্ষ্য’ ইত্যাদি। মাসুদা বিরচিত এসব বই শুধু মাত্র নারী চিত্তেই ঝড় তুলেনি, পুরুষদেরও যথেষ্ট আগ্রহীশীল করে তুলেছে তার বই অধ্যয়নে।
হাফেজা আসমা খাতুন
বাংলাদেশের ইসলামী আন্দোলনে হাফেজা আসমা খাতুন একটি অতি সুপরিচিত নাম। নারীদের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছিয়ে দেয়ার প্রয়োজনে তিনি বিভিন্ন পত্রিকায় সময়ের দাবি অনুযায়ী প্রবন্ধ নিবন্ধ লিখে চলছেন। তাঁর লিখিত প্রবন্ধ ‘আপনার শিশুকে কি শিক্ষা দেবেন’ মাসিক পৃথিবী : ফেব্রুয়ারি ১৯৯২, ‘নারী মুক্তি আন্দোলনের অগ্রদূত মহানবী (সা.)’ সাপ্তাহিক সোনার বাংলা : ‘১৯৮৪, ‘বর্তমান সমাজের অবক্ষয় প্রতিরোধে মাহে রমজানের গুরুত্ব’-আল মুনীর সিয়াম স্মারক গ্রন্থ-১৯৯৯, ‘রমজান ও ব্যক্তি চরিত্র সংস্কার’ ‘সিয়াম’ বিশেষ সংখ্যা ১৯৯১ প্রকাশিত হয়। এছাড়াও তাঁর প্রচুর লেখা বিভিন্ন পত্রিকার পাতায় ছাপা হয়েছে।
শামসুন্নাহার নিজামী
বাংলা ভাষায় ইসলামী সাহিত্য চর্চায় যে কয়েকজন নারী বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন তাঁদের অন্যতম মোহতারামা শামসুন্নাহার নিজামী। শামসুন্নাহার নিজামী ঝিনাইদহ জেলায় এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে ১৯৫১ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম আফজাল হোসেন, মাতার নাম- মোহতারামা মরিয়ম নেসা। তিনি ১৯৭৪ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উদ্ভিদ বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৭৮ সালে তিনি মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। সুসাহিত্যিক বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ ও মুসলিম বিশ্বে ইসলামী আন্দোলনের বিশিষ্ট সিপাহসালার মতিউর রহমান নিজামীর সংস্পর্শে এসে শামসুন্নাহার নিজামী ইসলামী সাহিত্য রচনার বিশেষ অনুপ্রেরণা লাভ করেন। তাঁর বেশির ভাগ লেখা ৭০-৮০ দশকে প্রকাশিত হয়। ইসলামের বিভিন্ন দিক নিয়ে তিনি মাসিক বেগম, মাসিক মদিনা, সাপ্তাহিক সোনার বাংলা ও দৈনিক সংগ্রামসহ বিভিন্ন পত্রিকায় লেখালেখি করেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হলো ‘আদর্শ সমাজ গঠনে নারী’, ‘নারী মুক্তি আন্দোলন’, ‘নারী নির্যাতনের কারণ ও প্রতিকার’, ‘পর্দা একটি বাস্তব প্রয়োজন’, ‘দ্বীন প্রতিষ্ঠায় মহিলাদের দায়িত্ব ইত্যাদি। তিনি ইসলামী আন্দোলন ও সাহিত্য রচনার পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক কাজেও বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন। সামসুন্নাহার নিজামী ১৯৮৯ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত ‘মানারাত ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল কলেজে যোগ্যতার সাথে অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন।
ফজিলা তাহের
ফজিলা তাহের ইসলামী আন্দোলনের ময়দানে এক অতি সুপরিচিত নাম। ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ক সম্পর্কে তিনি দেশের বিভিন্ন নামকরা পত্রিকাতে লিখে চলেছেন বিরামহীনভাবে বহুদিন ধরে। প্রাবন্ধিক হিসেবে তিনি ইসলামী মহলে যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেছেন। তাঁর প্রবন্ধাবলী মাসিক পৃথিবীতে প্রকাশিত ‘আল্লাহর আইন ও শরিয়তে মেয়েদের অধিকার-মর্যাদা’ সেপ্টেম্বর ১৯৯৪, ‘আমল নামার হাকিকত’ ডিসেম্বর ১৯৯৪, ‘মেয়েদের ইসলামী শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা’, সেপ্টেম্বর ১৯৮৬, ‘কুরআন থেকে হেদায়াত লাভের উপায়’ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬, ‘সংযত জবান : মুমিনের বৈশিষ্ট্য’ জানুয়ারি ১৯৮৭, ‘মহিলাদের ইসলামী পুনর্জাগরণে সাইয়েদ আবুল আলার অবদান; নভেম্বর ১৯৮৯, ‘ইসলামে মেয়েদের অধিকার ও কর্মসংস্থান প্রসঙ্গ’ মে ১৯৯১, ‘প্রসঙ্গ শাফায়াত’ ডিসেম্বর ১৯৯০, ‘কন্যা সন্তান : আমাদের মানসিকতা এবং ইসলাম’ এপ্রিল ১৯৯৩, ‘ইসলামী অর্থ ব্যবস্থায় মেয়েদের অধিকার’ ইত্যাদি। ফজিলা তাহের ‘শিল্পের জন্য শিল্প’ তত্ত্বে বিশ্বাসী নন। তাঁর সাহিত্য রচনা ইসলামী আন্দোলনের অনুসঙ্গ মাত্র। খাদিজা আখতার রেজাই
ইসলামী সাহিত্য ও সাংবাদিকতার জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। খাদিজা আখতার রেজাই। তিনি ছিলেন ‘দৈনিক সংগ্রাম’-এর প্রথম মহিলা সম্পাদিকা। আশির দশকের শুরুর দিকে তিনি খুলনার ‘দৈনিক জনবার্তা’র সাহিত্য ও মহিলা সম্পাদিকা হিসেবে কয়েক বছর দায়িত্ব পালন করেন। তার লিখিত গ্রন্থের মধ্যে ‘মুসলিম নারীর দায়িত্ব ও কর্তব্য’, নির্বাচিতার কলাম’, ‘বুবু’, ‘নূরী’, ‘নারী এলিজাবেথের দেশে’, ‘তিন তলার সিঁড়ি’ উল্লেখযোগ্য। দেশের দৈনিক, সাপ্তাহিক ও মাসিক পত্রিকা সমূহে গত দুই দশক ধরে তার শত শত গল্প, প্রবন্ধ ও কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। তার গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য কর্মের মধ্যে রয়েছে বর্তমান কালের শ্রেষ্ঠ মুসলিম নাট্যকার তওফীকুল হাকীম মিশরীর ঐতিহাসিক প্রমাণ্য নাটক ‘মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’, এবং আল্লামা ছফিউর রহমান মোবারক পুরীর ‘আর রাহীকুল মাখতুম’ গ্রন্থ দ্বয়ের বঙ্গানুবাদ। ‘আর রাহীকুল মাখতুম’ গ্রন্থের অনুবাদ সম্পর্কে লেখক ও কবি আল মাহমুদ অনুবাদ গ্রন্থটিকে বাংলা সাহিত্যের একটি নতুন নির্মাণ বলে অভিহিত করেন। সৈয়দ আলী আহসান তার লিখিত প্রবন্ধে বলেন, খাদিজার অনুবাদে মাতৃভাষার দীপ্ত অহঙ্কার ও অঙ্গীকার দুটোই রয়েছে। খাদিজা অসাধারণ নৈপুণ্যের সাথে এবং অনুপম বাক্য বিন্যাসে গ্রন্থটির বাংলা অনুবাদ করেছেন; তার অনুবাদটি যেন অনুবাদ নয়- এ এক নতুন সৃষ্টি। ১৯৭৯ সাল থেকে খাদিজা আখতার রেজাই লন্ডনে আছেন এবং সেখানে বসেই তিনি তার সাহিত্য সাধনা চালিয়ে যাচ্ছেন।
সাবিনা মল্লিক
সাবিনা মল্লিক ইসলামী সাহিত্যের গল্প শাখায় এক নতুন ফোঁটা ফুল। বাংলায় ইসলামী সাহিত্যের সংগ্রামী পুরুষ মতিউর রহমান মল্লিকের সহধর্মিনী সাবিনা মল্লিক। তিনি নানা বিষয় নিয়ে সুস্থ জীবন বোধের নির্মল চাষ করেছেন তাঁর গল্পে। এতদিনে তিনি প্রচুর গল্প লিখেছেন। সাবিনার শিশু গল্প : ‘তালে তালে তাল’ জানুয়ারি ২০০৩, ‘ভেজা সময়’ নভেম্বর ২০০৪, ‘ভেতর বাড়ি বা’র বাড়ি’ সেপ্টেম্বর ২০০৬, ‘শুধু স্বপ্ন নয়’ জানুয়ারি ১৯৯৭, ‘রেহানার বিয়ে’ ইত্যাদি। সাবিনার গল্প শুধু মাত্র গল্প নয়, গল্পের ভেতর দিয়ে তিনি সমাজ সংস্কার ও নীতি নৈতিকতার শিক্ষা প্রচারের চেষ্টা চালিয়েছেন। তিনি কবিতা লিখেছেন অনেক। তাঁর কবিতায় প্রকৃতি ভিন্নভাবে ধরা দিয়েছে। যেমন : ‘আমি তাকিয়েই রইলাম টুপটুপ করে ঝরে পড়বার মুহূর্ত পর্যন্ত আর তাকিয়ে রইলাম অশ্রুকণা আমার মুখে নেমে আসা পর্যন্ত আর আমি তাকিয়েই রইলাম চাঁদটির কান্নার স্রোতে আমার চোখ, আমার গাল আর আমার চিবুক ভেসে যাওয়া মুহূর্ত পর্যন্ত॥’ (একাকী চাঁদটা কাঁদছিল)
সাপ্তাহিক সোনার বাংলায় প্রকাশিত